উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুরের ৬-৭টি ইউনিয়নে অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল দিয়ে অবাধে দেশি মাছ ও মাছের পোনাসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী-উদ্ভিদ, খাদ্যকণা (প্লাঙ্কটন) নিধন করছে অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীরা। হালকা ও মিহি বুননের ছোট ফাঁসের এই জালে আটকা পড়ে বেঘোরে মারা পড়ছে নানা প্রজাতির মাছ, পোনা। সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ওটরা, শোলক, বড়াকোঠা, জল্লা, হারতা, সাতলা, বামরাইল ও গুঠিয়া ইউনিয়নের নদ-নদী, খাল-বিলে চায়না দুয়ারী জাল পাতা রয়েছে। ওটরা টু মশাং ৬ কিলোমিটার খালে, বড়াকোঠা হয়ে শোলকে, হারতা , সাতলা, ও জল্লার বিল জুড়ে চায়না দুয়ারী জাল পাতা রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নের চিত্র একই রকম দেখে গেছে। সন্ধ্যা শাখা নদীতে নেট দিয়ে চারপাশে আটকিয়ে চায়না দুয়ারি জাল পেতে মাছ ধরছে অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীরা। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরতে পারায় কারেন্ট জালের চেয়েও বিপজ্জনক এই জাল অসাধু জেলেদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক জেলেরা বলেন, এক রাতে এই জালে যে পরিমাণ মাছ ওঠে, তা অন্য কোনো জালে উঠে না, সেই তুলনায় পরিশ্রমও তেমন করতে হয় না। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ, বেশি আয় হয় বলেই এই জাল দিয়ে মাছ ধরি। এই জাল দিয়ে মাছ ধরলে দেশি মাছ ধব্বংস হচ্ছে তাহলে কেন এই জাল দিয়ে মাছ ধরা হচেছ জানতে চাইলে বলেন, পেটের দায়ে এই কাজ করছি, আমরা জানি এতে ক্ষতি হয় , আমরা কি করমু কন, আমাগোতে পেট চালাতে হয়, সংসার ও ছেলে মেয়ে আছে। আমাদেরতো সরকার তেমন কোন সহযোগীতা করে না। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে মাছ ধরার জালের ফাঁসের অনুমোদিত পরিমাপ রয়েছে; সাড়ে ৫ সেন্টিমিটার (সংশোধিত আইন)। জালের ‘ফাঁস’এর চেয়ে কম হলে তা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। দেশে নিষিদ্ধ জালের তালিকায় চায়না দুয়ারির নাম উল্লেখ না থাকলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ। গোল লম্বাকৃতির এই জাল স্রোতের মুখে ফেলে রাখলে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা ছোটবড় মাছ একবার ভেতরে ঢুকলে আর বেরোতে পারে না। ফলে এই জালে অসংখ্য মাছ, মাছের পোনাসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী-উদ্ভিদ, খাদ্যকণা (প্লাঙ্কটন) ধ্বংস হচ্ছে। এতে মাছের বংশবিস্তার মারাত্মক হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্য অধিদপ্তর। চায়না দুয়ারি নামে পরিচিত এই জাল দেশেই উৎপাদিত হয়। দৈর্ঘ্য ও মানভেদে একটি চায়না দুয়ারির দাম স্থানীয় বাজারে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তবে জালের সুতা সূক্ষ্ম আর মিহি বলে অনেকের ধারণা, এই জালের সুতা চীন থেকে আমদানি করা হয়। তাই জালটির নামের সঙ্গে ‘চায়না’ শব্দটি যুক্ত হয়ে গেছে। বিশেষ এই জালের দুই মাথা খোলা বলে একে ‘দুয়ারি’ বলা হয়। চায়না দুয়ারিকে জাল হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এটা চাঁই বা কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর এক ফাঁদ। এই জাল এমনভাবে বোনা হয়েছে যে একটি গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব খুব কম। মূলত মশারি তৈরির নেটের আদলে এই জাল বোনা। এ জন্য এতে মাছ একবার ঢুকলে আর বের হতে পারে না। জালটি ‘চায়না জাল’, ‘ম্যাজিক জাল’ নামেও পরিচিত। । সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ এই জাল। প্রস্থে এক থেকে দেড় ফুট আর এর গিঁট বা ফাঁস এতই ক্ষুদ্র যে পানি ছাড়া আর কোনো কিছু বের হতে পারে না। জালের মধ্যে দেওয়ার জন্য লোহার চারকোনা রড দিয়ে অনেকগুলো ফ্রেম বসিয়ে এই জাল তৈরি করা হয়। এটি নদীর একেবারে তলদেশ পর্যন্ত যায় এবং তলদেশের মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। ফলে কোনো মাছ একবার জালে ঢুকলে আর বের হতে পারে না। বাংলাদেশে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী উন্মুক্ত জলাশয়ে জন্মানো প্রতিটি মাছকে একবার ডিম ছাড়া ও বাচ্চা ফুটানোর সুযোগ দিতে হবে। তার আগে মাছের পোনা ধরা আইনত দÐনীয় একটি অপরাধ। উজিরপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান সমকালকে বলেন, মৎস্য আইনে ‘চায়না দুয়ারী’ এই জাল নিষিদ্ধ। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় এই জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি আমরা। বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। , অবৈধ জালপাতা নিয়ে আমাদের দপ্তর উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবাণী পৌছে দেয়া হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর পরেও আইনকে উপেক্ষা করা হলে অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।