ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের বাড়ি যে এলাকায়, সেই বরিশালেই সংগঠনের কমিটির মেয়াদ পেরিয়ে গেছে ১০ বছর হলো। বরিশালে জেলা কমিটির পাশাপাশি মহানগরেও প্রায় এক দশকেও কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেই।

ছাত্রলীগ সভাপতির পৈতৃক ভিটা বরিশালের বাবুগঞ্জে হলেও জয়ের পরিবারের বর্তমান বসবাস মহানগরে। ২০১৯ সালে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ২০২০ এ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ সভাপতি হন তিনি।

২০১১ সালে বরিশাল মহানগর ও জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। মহানগরে সভাপতি জসীম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয় তৌসিক আহম্মেদ রাহাতকে।

অপরদিকে হেমায়েত উদ্দিন সেরনিয়াবাত সুমনকে সভাপতি, আব্দুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক এবং শামসুদ্দোহা আবিদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয় জেলা কমিটি।

মেয়াদ উত্তীর্ণের পর ২০১৪ সালের জুন মাসে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয় ১০৯ সদস্য নিয়ে। তবে মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি নানা চেষ্টার পরও।

এই দুই কমিটির একাধিক নেতা দূরন্ত নিউজকে বলেছেন, তারাও আর নেতৃত্বে থাকতে চান না। একজন আওয়ামী লীগের কমিটিতে ঢুকেছেন, কয়েকজন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন।

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক, বিয়েও করেছেন। আর সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক দুই সন্তানের জনক। সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুদ্দোহা আবিদ অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছাত্ররাজনীতি থেকে।

মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার কিছুদিন পরই সাংগঠনিক সম্পাদক তৌছিক আহম্মেদ রাহাত ছাত্ররাজনীতি থেকে অবসরে যান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়ে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরণের মৃত্যুর পর নানা রাজনৈতিক কারণে বরিশাল ছাড়েন সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান। ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক নারীকে অপহরণের অভিযোগে আটক হন আগ্নেয়াস্ত্রসহ। ছাত্রলীগ থেকে কিছুদিন পর বহিষ্কারও করা হয় তাকে।

তবে অসীম দেওয়ান দূরন্তনিউজের কাছে দাবি করেছেন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তা ছাড়া আদালত জানিয়েছে অপহরণের বিষয়টি ভুয়া।

সভাপতি জসীম উদ্দিন বিয়ের পরের দিনই আসামি হয়েছেন ধর্ষণ মামলার। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে ধর্ষণের পর গর্ভপাতও করানো হয় বাদীকে। যদিও বিষয়টিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি জসীম উদ্দিনের।

বিতর্ক আর বিবাহিতদের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুনদের সুযোগ দেয়ার জন্য কমিটি গঠনের দাবি আছে ছাত্রলীগে। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতির নিজ এলাকায় মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নেতা-কর্মীরা।

বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের কর্মী ফারদিয়ান হাসাান বলেন, ‘১০টা বছর কমিটি নেই। যারা কমিটির আশায় ছিলেন তারাও বিয়ে করেছেন কিছুদিন আগে। এখন নতুনরা কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন। আমরা চাই দ্রুত কমিটি হোক বিতর্কিতদের সরিয়ে। যারা কমিটিতে পদ পেয়েই অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনে মেতে ছিলেন তাদের বহিষ্কার করে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা হোক।’

রাশেদুল ইসলাম নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি জয় ভাইয়ের নিজ এলাকা বরিশাল। সেখানেই কমিটি না হওয়ায় আমরা আশাহত। নতুন কমিটি হলে নতুন উদ্দীপনা থাকবে। চাঙা হবে সংগঠন। যেখানে মহানগর ছাত্রলীগ পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় সেখানে কমিটির দাবি করা অযৌক্তিক বলে মনে করছি না। তা ছাড়া সভাপতি জয় ভাইয়ের নিজ এলাকায়ই যদি কমিটি গঠনে ব্যর্থ হয় তাহলে কী করার আর?’

তিনি জানান, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলেন সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত আর সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন রাজীব হোসেন খান। পাশাপাশি মহানগরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন আতিকুল্লাহ মুনিম, গোলাম মোস্তফা অনিক, রইজ আহম্মেদ মান্নাসহ অনেকে। তবে এরা সবাই বিবাহিত হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এরা আর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকার যোগ্য নন।

তবে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ ফারুক শামীম এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর বলয়ে অনেকেই এখন মহানগর ও জেলা ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশী।

বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগ নেতা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের কমিটি গঠন হচ্ছে না, আমরাও চাই দ্রুত কমিটি গঠন করা হোক। সর্বোপরি আমাদের নেতা বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ আমাদের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সেটাই আমরা মেনে নেব।’

বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজভী আহম্মেদ রাজা রাঢ়ী বলেন, ‘কমিটি অনেক বছর ধরে গঠন না হওয়ায় অনেকেই সংগঠনের নাম খারাপ করছেন, বিতর্কিত করছেন ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনকে।’

বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরাও চাই নতুন নেতৃত্ব আসুক। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ছাত্রলীগের বর্তমানে পদে রয়েছি। নতুন নেতৃত্ব না এলে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়ে যাবে। যোগ্যরাও বঞ্চিত হবেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে দাবি জানাব মহানগর ও জেলা ছাত্রলীগের কমিটি যেন তারা দ্রুত গঠন করে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ক্ষুদে বার্তারও কোনো উত্তর দেননি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এই নেতা।