প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর, অর্থ্যাৎ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম। এখানে দুই প্রজন্মের ব্যবধান কতটা? ১০, ১২ কিংবা ১৫ বছর! এর বেশি নয় অবশ্যই। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথচলা যখন থেকেই হয়ে থাকুক, আধুনিক ক্রিকেটের পথচলা নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ সালে জন প্লেয়ার গোল্ডলিফ ট্রফি তথা এশিয়া কাপ থেকে!

শ্রীলঙ্কার মোরাতুয়ায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ বাংলাদেশ নেমেছিল ঐতিহাসিক এক ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে। যেটার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের নাম প্রথমবারের মত অন্তর্ভূক্ত করতে পেরেছিলো টাইগাররা। সেই প্রজন্মের নেতৃত্বে ছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। দলের মধ্যমনি ছিলেন নিঃসন্দেহে রাকিবুল হাসান, নুরুল আবেদিন, রফিকুল আলম, জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ কিংবা গোলাম নওশের প্রিন্সরা।

এরপরের প্রজন্মের নেতৃত্ব এসেছিলো কখনো আকরাম খান, আবার কখনও মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর কাঁধে। মধ্যমনি ছিলেন ফারুক আহমেদ, আতহার আলি খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল কিংবা এনামুল হক মনিরা। এদের হাত ধরে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় হয়।

২০০০ সালে শুরু ক্রিকেটের কুলিন শ্রেণি- টেস্টে পথচলা। তখনকার প্রজন্মে নেতৃত্বের ব্যাটন হাতবদল হয়েছে নাঈমুর রহমান দুর্জয়, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট এবং হাবিবুল বাশার সুমনের কাছে। এ সময় মধ্যমনি ক্রিকেটার ছিলেন নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ রফিক। এই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের লিটল মাস্টার হিসেবে উত্থান ঘটেছে মোহাম্মদ আশরাফুল এবং গতি দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়া পেসার মাশরাফি বিন মর্তুজার।

হাবিবুল বাশারের পর একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ই গিয়েছে বলা যায়। সে সময়টায় অধিনায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। নেতৃত্বের ভারেই হয়তো বা নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যকেও এ সময় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। আশরাফুলের পর শুরু হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল এবং উজ্জ্বল পারফরম্যান্স এনে দেয়া অধ্যায়ের। এই প্রজন্মের ব্যাপ্তিও অনেক বড়। সাফল্যের হারও অনেক বেশি।

২০০৯ সাল। মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে নেতৃত্বে আনা হলো মাশরাফি বিন মর্তুজাকে। সাকিব আল হাসান হলেন তার সহকারী। প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর। ভঙ্গুর ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে প্রথম টেস্টেই জয় বাংলাদেশের। কিন্তু এই ম্যাচেই ইনজুরিতে পড়লেন মাশরাফি। ম্যাচের শেষ দিন তিনি মাঠে নামতে পারলেন না। সহকারী অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে দিনটি পার করলো বাংলাদেশ দল এবং জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লো।

মাশরাফি সেই যে ইনজুরির কারণে দল থেকে বাদ পড়লেন, আর ফিরতে পারলেন না। ভারপ্রাপ্ত থেকে ধীরে ধীরে ভারমুক্ত অধিনায়ক হয়ে গেলেন সাকিব। যার নেতৃত্বে ঘরের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপ খেললো বাংলাদেশ। এরপর নেতৃত্বের ব্যাটন মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি, মাহমুদউল্লাহ, সাকিব কিংবা তামিমের হাতেই ঘুরেছে। শেষে কিছুদিন টেস্ট নেতৃত্ব ছিল মুমিনুলের কাঁধে।

কিন্তু ২০১১ সালের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে উপরোক্ত পাঁচ ক্রিকেটারের ওপর। যাদেরকে নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ ক্রিকেপের ‘পঞ্চপাণ্ডব। কি নেতৃত্ব আর কি পারফরম্যান্স- সব জায়গায়, সব ম্যাচেই এই ৫ জন। মাঝে কদাচিত অন্য কেউ দু’এক ম্যাচে পারফরম্যান্স করলেও তাদেরকে পড়ে থাকতে হয়েছে পঞ্চপাণ্ডবের ছায়ার আড়ালে।

গত একযুগে কতজন এলেন-গেলেন; কিন্তু এই পাঁচজনের আসন কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্রিকেট মানেই পঞ্চপাণ্ডবের বিচরণ, এটা যেন অবশ্যম্ভাবী একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু একটা প্রজন্ম কত বছর টেকে? কতবছর সেই প্রজন্ম নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে থাকতে পারে? ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন মাশরাফি। লঙ্গার ভার্সনে আর তার ফেরা হয়নি কখনো। ২০১৭ সালে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের কারণেই হোক বা নিজ ইচ্ছায়- টি-টোয়েন্টিকে বিদায় বলেছেন তিনি। ২০২১ সালের পর তো আর ওয়ানডেও খেলছেন না। সুতরাং, বলা যায় মাশরাফি অধ্যায় শেষ।

টেস্ট থেকে বিদায় নিয়ে ফেলেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও। সম্প্রতি টি-টোয়েন্টিকে বিদায় বলেছেন তামিম ইকবালও। কিছুদিন ধরে দলের মধ্যে পঞ্চপাণ্ডবের উপস্থিতিকে নানাভাবে খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মাহমুদউল্লাহর টেস্ট থেকে বিদায়টা সুখকর ছিল না। অনেকটা অভিমান করেই সরে দাঁড়িয়েছেন। মাশরাফি একটা ফেয়ারওয়েল চেয়েছেন, পাননি। তামিম ইকবালের জন্যও টি-টোয়েন্টি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে পরিবেশটা অনুকূল ছিল না। যে কারণে, তিনি এই ফরম্যাটকে বিদায় বলে দিলেন।

সাকিবের অবস্থা- এই আছি তো, এই নেই। নিজের ইচ্ছেয় খেলেন, ইচ্ছে হলে খেলেন না। বিসিবি নিজেদের মনের মত করে কখনো সাকিবকে দলে পায় না। বাকি আছেন মুশফিুর রহিম। তাকে নিয়েও কিছুদিন আগে আকারে-ইঙ্গিতে কথা উঠেছিল, বোর্ডের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে সসম্মানে সরে জেতেও বলা হয়েছিল সেই ইঙ্গিতে। যদিও ব্যাট হাতেই জবাব দিয়েছিলেন মুশফিক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলে তার অপরিহার্যতার কথা। ওই সময় আবার তার স্ত্রীও ইনস্টাগ্রামে বিসিবিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, ‘রিপ্লেসমেন্ট রেডি আছে তো!’

পঞ্চপাণ্ডব প্রজন্মের শেষটা দেখে ফেলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা। এবার তার আনুষ্ঠানিকতাও হয়ে গেলো। জিম্বাবুয়ে সফরে টি-টোয়েন্টি দলটি দেখে অবাকই হওয়ার কথা। যদিও, ভবিষ্যতের কথা ভেবে বোর্ডকে এ পথে হাঁটতে দেখে বিশেষজ্ঞরা বাহবা দিচ্ছেন। পঞ্চপাণ্ডব তো আর সারাজীবন থাকবেন না, তাদের অনুপস্থিতিতে ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে এবং সেটা এখন থেকেই।

ভারত যেমন সে কাজটাই সুন্দরভাবে করে ফেলছে। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজগুলোতে নিচ থেকে নেতৃত্ব এবং খেলোয়াড়- দুটোই তুলে আনার চেষ্টা করছে। যে কারণে মাত্র এক-দেড় বছরে ভারতীয় ক্রিকেটে সাত-আটজন অধিনায়কের দেখা মিলছে। দেখা যাচ্ছে অনেক নতুন নতুন মুখ। চূড়ান্ত কোনো প্রতিযোগিতায় এখান থেকেই ক্রিকেটার বাছাই করে শক্তিশালী দল গঠন করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এখন থেকে বাংলাদেশকেও সে পথে হাঁটতে হবে, সন্দেহ নেই। পঞ্চপাণ্ডব প্রজন্মের প্রায় একযুগ পার হয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে। এবার তাদের ছাড়াই নিজেদের ক্রিকেটে কোমরের শক্তি কেমন, তা পরীক্ষার সময় এসেছে। এ কারণেই পঞ্চপাণ্ডবের কোনো সদস্যকে ছাড়াই জিম্বাবুয়ে সফরের দল ঘোষণা করা হলো। নেতৃত্ব তুলে দেয়া হলো নুরুল হাসান সোহানের কাঁধে।

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেটে নব যুগের সূচনা এটি। হয়তো বা সামনের কোনো টি-টোয়েন্টি সিরিজে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সোহান অধিনায়ক থাকবেন না। হয়তো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কিংবা সাকিব আল হাসানকেই নেতৃত্ব দেয়া হবে। সেখানে হয়তো মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা দলে থাকতে পারেন।

কিন্তু সময় থাকতেই ‘ভবিষ্যৎ তৈরি’র যে প্রথম পদক্ষেপ বিসিবি নিয়ে নিলো- তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। একদল তরুণ যে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত, তার চিত্রটা এই দলের মধ্য দিয়ে পরিস্কার হয়ে গেলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট যে পঞ্চপাণ্ডবকে ছাড়াও চলতে পারে, তার প্রথম পরীক্ষা শুরু হবে জিম্বাবুয়ে সফরে টি-টোয়েন্টির মধ্য দিয়ে।

অনেকেই বলবেন, এই বছরের একেবারে শুরুতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে যে টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ, তার পরের টেস্টে পঞ্চপাণ্ডবের কেউই ছিল না! কথা সত্য। তবে, বিষয়টা সেই সফরে তো দলের সঙ্গে মুশফিকুর রহিম ছিলেন। ইনজুরির কারণে তিনি শেষ টেস্ট ম্যাচটি খেলতে পারেননি; কিন্তু এবার পার্থক্য হলো, সিনিয়রদের কেউই এখন আর দলে নেই। জুনিয়ররাই পুরো দল পরিচালনা করবেন। অধিনায়ক সোহান, তার সঙ্গে লিটন, মিরাজ, তাসকিন, মোস্তাফিজ, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, আফিফ হোসেন ধ্রুবরা।

টি-টোয়েন্টিতে এমনিতেই বাংলাদেশ শক্তিশালী না। বিসিবির নানা চেষ্টা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী দল কোনোভাবেই দাঁড়ায়নি। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের তথৈবচ অবস্থা অবলোকন করেছে সবাই। এরপরও কোনো টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সেভাবে বাংলাদেশ নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি।

এমনকি সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও। বরং, বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর পর্যন্ত- প্রতিটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তো তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দিচ্ছিল- তিনি আর টি-টোয়েন্টির মত দ্রুততম ক্রিকেটের উপযোগি না।


যে কারণে বিসিবি সভাপতিকে মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্ব নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি জবাবে কিছুটা কুটনীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। বলে দিয়েছেন, ‘রিয়াদ ফর্মে নেই। রান পেলে হয়তো এত কথা উঠতো না। যেহেতু রানে নেই, সে কারণে কথা উঠছে।’ একই সঙ্গে এটাও বলে দিয়েছেন, টি-টোয়েন্টিতে সমস্যা অনেক। শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আসবে না। বরং দলের মধ্যে অনেক বেশি পরিবর্তন আনতে হবে।

বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন যে এতবড় পরিবর্তন আনবেন, তা হয়তো কেউ ভাবেননি। মাহমুদউল্লাহকে তো বাদ দিলেনই, সঙ্গে মুশফিককেও দলে নিলেন না। হজ থেকে ফিরেই দলে ফেরার জন্য কঠোর অনুশীলন করে যাচ্ছিলেন মুশফিক; কিন্তু বিশ্রামের নাম দিয়ে তাকেও বাদ দেয়া হলো।

এর মধ্য দিয়ে বিসিবির বার্তা পরিষ্কার। তারা আগামীদিনের ক্রিকেট নিয়ে ভাবছে। যেখানে সাকিব, মুশফিক কিংবা মাহমুদউল্লাহরা নেই। সাকিব হয়তো কিছুদিন থাকবেন, তার ব্র্যান্ড ভ্যালু, ক্রিকেটীয় মেধা এবং যোগ্যতা দিয়ে। তবে সেটার স্থায়িত্বও খুব বেশিদিন হয়তো নয়।


সুতরাং, নবযুগের সূচনা ঘটানো লাগতোই। আর সেটা শুরু হলো জিম্বাবুয়ে সফরের মধ্যদিয়েই। নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেয়ার সৌভাগ্য পেলেন নুরুল হাসান সোহান। দলের মধ্যমনি হয়ে থাকবেন- লিটন, মিরাজ, মোস্তাফিজ, তাসকিন, আফিফ, নাজমুল হোসেন শান্ত, নাসুম আহমেদ এবং শরিফুল ইসলামরা।

এখন দেখার নতুন এই প্রজন্ম বাংলাদেশকে কতটা সাফল্য এনে দিতে পারেন!