নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া প্রকল্পের ব্যায় কমানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। পাশাপাশি প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই করতেও বলা হয়েছে।
নতুন ২ লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয় এবং আনুষঙ্গিক আরও কিছু খাতে ব্যয়ের খাত কমিয়ে নতুন করে প্রাক্কলনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী সপ্তাহের শুরুতে ফের অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। প্রকল্পটির দ্রুত অনুমোদন চায় কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। কিন্তু ইসি মনে করছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এ ছাড়া এ জন্য সময়ও প্রয়োজন। তাই এর একটি বিকল্পও ভেবে রেখেছে ইসি।

বাজার যাচাই না করেই ইভিএম কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রসঙ্গে গতকাল নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ইভিএম ক্রয়ে বাজার যাচাই করার সুযোগ নেই। কারণ এ মেশিনটির সোর্স (উৎস বা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অর্থে) একটাই। তিনি জানান, ইভিএমের একমাত্র সোর্স বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনার আলমগীর আরও বলেন, ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করতে হয়। ইভিএম ক্রয়ের প্রকল্পটি ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম নয়। এটি ভিন্ন প্রকৃতির প্রকল্প। আগের কেনা দেড় লাখ ইভিএম আমরা এখন পুরোদমে ব্যবহার করছি বিভিন্ন নির্বাচনে। এখানে সেটিই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির প্রয়োজন।

ইসি আলমগীর আরও বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের বাজেট কমে গেলে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে না। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের আরও জানান, আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ইসির প্রস্তাবিত প্রকল্প পাস না হলেও আগামী জাতীয় নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।

প্রসঙ্গত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২ লাখ ইভিএম কেনার লক্ষ্যে নতুন একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে ইসি। ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পে প্রতিটি ইভিএমের দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা করে। মাঠ পর্যায়ে ৫২২টি থানা নির্বাচন কার্যালয়ের ও ঢাকার জন্য মোট ৫৩৪টি পিকআপভ্যান কেনার বিষয়টি রাখা হয়েছে প্রকল্পে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে পিকপ্রতি ৬৫ লাখ করে ৩৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১০টি গুদামের প্রতিটিতে ৩৭ কোটি টাকা করে মোট ৩৭৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। গুদামের ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ৪০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ইভিএম কাস্টমাইজেশন সেন্টার স্থাপন, গুদাম নির্মাণ, ইভিএম পরিবহন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। প্রশিক্ষণ ব্যয় ২০৫ কোটি টাকা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ধরা হয়েছে ৬৯০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পিকআপভ্যানের জন্য ড্রাইভার, থানা নির্বাচন কার্যালয় প্রতি একজন সহকারী প্রোগ্রামার, একজন ইভিএম অপারেটরসহ তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী; এসব খাতে ১ হাজার ৫০০ লোকবলের বেতন প্রভৃতি খাতে ওই ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

ইসির এই প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে গত ২০ অক্টোবর দৈনিক আমাদের সময়ে ‘ইভিএমের জন্য ৫৩৪ গাড়ি কিনবে ইসি’ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে নানা খাতে ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতেই বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ইসি। সূত্রমতে আজ বৃহস্পতিবারই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে পারে। বৈঠকে প্রকল্প প্রস্তাবে কিছু সংশোধনী আনার পর আগামী সপ্তাহের শুরুতে ফের পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। এক্ষেত্রে ৫৩৪টি পিকআপভ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় কমে আসতে পারে। শুধু তাই নয়, আরও বেশকিছু খাতে সংশোধনী আসতে পারে। পর্যবেক্ষণে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। তাই এর বিকল্প নিয়ে ভাবছে নির্বাচন কমিশন। ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ এ প্রসঙ্গে গতকাল বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি হয়নি। আগামীকাল (আজ) একটা মিটিং আছে। আমাদের একটা টেকনিক্যাল কমিটি আছে। সেই কমিটিতে বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আছেন। ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির বিকল্প হিসেবে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

চলমান ইভিএম প্রকল্পটি ২০১৮ সালে নেওয়া। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেড় লাখ ইভিএম কেনার লক্ষ্যে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। তখন প্রতিটি ইভিএমের দাম ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৫ হাজার টাকা করে এবং একই সোর্স থেকে (বিএমটিএফ) মেশিনগুলো কেনা হয়েছিল।