ঢাকা : বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত আসার পর থেকেই চাহিদা বাড়ছে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের। এর মধ্যে রয়েছে চার্জার ফ্যান, কুলার, জেনারেটর, আইপিএস, ব্যাটারি ও লাইট।


সরকারি সিদ্ধান্তের সুযোগে বিক্রেতারা এসব পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। ক্রেতা সাধারণের অভিযোগ, দফায় দফায় চার্জিং পণ্যের দাম বাড়ছে।
তাদের দাবি, বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চার্জিং ইলেক্ট্রনিক পণ্যের দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন বিক্রেতারা। এক সপ্তাহ আগে যে চার্জার ফ্যানের দাম ছিল সাড়ে ৩ হাজার টাকা, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজারে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, বিশ্ববাজারে ডলারের দাম ওঠানামা করায় এলসি বা ঋণপত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যে কারণে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) রাজধানীর নবাবপুর রোড, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম স্টেডিয়াম মার্কেটসহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে ইলেক্ট্রনিক পণ্য বাজারে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। বেশিরভাগ রিচার্জেবল ফ্যান-লাইট, কুলার, আইপিএস এবং সোলার পণ্য বিক্রির শো-রুমে ভিড় বেশি।

জানা গেছে, সরকার লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বাজার থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে চার্জার ফ্যান, লাইট, জেনারেটর, ব্যাটারি, চার্জার লাইট, আইপিএস ও সোলার। রাজধানীতে লোডশেডিং বাড়ায় এসব পণ্যের চাহিদা বাড়লেও যোগান নেই। এ সুযোগে বিক্রেতারা পণ্যগুলো স্টক করে রেখেছেন। অনেকে পণ্য না পেয়ে বিক্রিও বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুদিন ধরে অধিকাংশ ক্রেতাই চার্জার ফ্যান চাইছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ফ্যানের অর্ডার আসছে। কুলার, আইপিএস ও সোলার প্যানেলের তুলনায় চার্জার ফ্যান বিক্রি বেড়েছে বেশি। অন্য কোনো বছর এত ফ্যান বিক্রি হয়নি। এতে সরবরাতে সংকট দেখা গেছে, যে কারণে দাম বেড়েছে। তাদের দাবি, ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি কমেছে। মার্কেটে এসব পণ্যের সংকট থাকলেও চাহিদা বাড়তি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এসব ইলেক্ট্রনিক পণ্যের দাম বেড়েছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মার্কেটে পণ্য নেই। আমদানিকারকরা দাবি করছেন, ডলারের বাড়তি দামের কারণে পণ্য আমদানি কমেছে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন, অতিরিক্ত গরম, তার ওপর সরকার লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর থেকে আমদানিকারকরা চার্জিং পণ্য বেশি দামে বিক্রি করছেন। তারাও বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনে, বাড়তি দামেই বিক্রি করছেন।

নবাবপুর আর রহমান ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের ঢাকা ইলেকট্রনিক্সের ম্যানেজার মো. রাজা বলেন, গত দুই সপ্তাহে কোনো কোনো পণ্যের দাম এক হাজার টাকা বেড়েছে। চায়নার একটি চার্জার ফ্যানের মূল্য ছয় মাস আগে ছিল তিন হাজার টাকা। সেটি এখন কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। আমাদের তাহলে কত টাকায় বিক্রি করতে হবে?

তিনি জানান, ডলারের মূল্য বাড়ায় আমদানি কমের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা মালামাল দিচ্ছেন না। তাই বাজারে চার্জার ফ্যান, লাইট, কুলারসহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক পণ্যের সংকট রয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, তাই আমাদেরও বেশি দামে কিনে বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে আমাদের লাভও হয় সামান্য।

এদিকে, ইলেক্ট্রনিক পণ্য আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে উঠছে সিন্ডিকেট করার অভিযোগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট একজন বাংলানিউজকে বলেন, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। তাদের কাছে গেলেই সব জানা যাবে। পণ্যগুলোর দাম বাড়বে নাকি কমবে, সিন্ডিকেটে জড়িতদের ওপরই সব নির্ভর করে।

নবাবপুর রোডের পাওয়ার মেশিনারিজ স্টোরের ম্যানেজার মো. পারভেজ বাংলানিউজকে বলেন, প্রতি বছর মার্চ থেকে ইলেক্ট্রনিক্স বা চার্জার পণ্যের চাহিদা বাড়ে। জুলাই-আগস্টের দিকে কমে যায়। কারণ, তখন গরম খুব একটা থাকে না। কিন্তু এ বছর ব্যতিক্রম। আবার সিজনের শেষে লোডশেডিংয়ের ঘোষণায় বর্তমান সংকট প্রতীয়মান। সরকারি ঘোষণার পর চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী পণ্য নেই। আবার ডলারের দাম বেশি, তাই আমদানিকারকরাও এলসি খুলছেন না। একমাস পর থেকে এসব পণ্যে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাবে। এখন উচ্চমূল্য দিয়ে পণ্য এনে বিক্রি না হলে পরবর্তীতে লোকসান দেখা দেবে, তাই অনেকেই এসব পণ্য বিক্রির জন্য আনছেন না।

লোডশেডিংয়ের কারণে বেড়েছে আইপিএস’র দাম। গত কয়েকবছর এ পণ্যের ব্যবহার খুব একটা দেখা না গেলেও গত দুদিন থেকে সিঙ্গার, রহিম আফরোজ, ফিলিপস, বাটারফ্লাই, নাভানা, সুকান ও অনিকসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আইপিএসের বিক্রি বেড়েছে।

ফরিদ হোসেন নামে বাটারফ্লাইয়ের একটি শো-রুমের ব্যবস্থাপক জানান, ওয়াট বা কার্যক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এ পণ্যের দাম বাড়ছে। তাদের ব্র্যান্ডের ৬০০ ওয়াটের একটি আইপিএস ৮৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাড়ে ছয় হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ ওয়াটের দাম।

ক্রেতাদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের সময়সূচি মানছে না বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। এলাকাভিত্তিক ঘণ্টাব্যাপী লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও কোথাও কোথায় তিন ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। ঢাকার বাইরে চার থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। যে গরম পড়েছে, তাতে বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায় হিসেবে আইপিএস বা চার্জিং পণ্য কিনছেন তারা।

নবাবপুর রোড থেকে ইলেকট্রনিক্স পণ্য কিনতে পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজার থেকে এসেছেন সাগর। তিনি জানালেন, গরমে তার ছোট বাচ্চাদের খুব কষ্ট হয়। মঙ্গলবার (২০ জুলাই) দুই-তিন দফা কারেন্ট গেছে। যে কারণে চার্জার ফ্যান কিনতে এসেছেন। কিন্তু যে দাম, তাতে বিপাকে পড়ে গেছেন তিনি। ঈদের আগে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় চার্জার ফ্যান দেখে গিয়েছিলেন, এখন সেটি সাড়ে ৬ হাজার টাকা হয়ে গেছে।

কেরানীগঞ্জে পোশাক বিক্রির শো রুম আছে কামরুল শেখের। তিনি জেনারেটর কিনেছেন। তিনি বললেন, গত দুই তিন দিন ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। আমার কাপড়ের একটি শো-রুম আছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে শো-রুমে থাকা যায় না। তাই একটি জেনারেটর কিনতে এসেছি৷ ১৫ ওয়াটের জেনারেটর নিয়েছি ৯২ হাজার টাকা দিয়ে। অথচ তিন বছর আগে একই পণ্য আমি কিনেছি ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে। দাম বাড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেই বলে ডলার দাম বাড়ছে ফলে আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে।

নারিন্দা থেকে স্টেডিয়াম মার্কেটে কুলার ফ্যান কিনতে এসেছেন প্রশান্ত। তিনি জানান, ঈদের আগে একটি নোভা ব্র্যান্ডের কুলার ফ্যান কিনেছি সাড়ে ৮ হাজার টাকায়। আরেকটি কিনতে এসে দেখি দাম ১১ হাজার টাকা হয়ে গেছে।

এদিকে অযৌক্তিক দাম নিয়ন্ত্রণে বাজারে নেমেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। গত মঙ্গলবার ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেটে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এসময় দুটি ইলেকট্রনিক্স দোকান মালিককে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই কারণে নবাবপুর ইলেকট্রনিক্স মার্কেটেও অভিযান চালায় ভোক্তা অধিদপ্তর। সেখানেও বেশি মুনাফা করায় দ্য লাকি ইলেকট্রিক এজেন্সিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

এ ব্যাপারে সংস্থার মহাপরিচালক (ডিজি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, চার্জার লাইট-ফ্যানের দাম বাড়ানো সম্পূর্ণ অনৈতিক। দোকানিদের কাছে বা স্টকে যে পণ্যগুলো আছে সেগুলোর তো দাম বাড়েনি। এভাবে মানুষকে জিম্মি করা, ঠকানোর বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলবে।