রাজনৈতিক সংঘাতে হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস। তিনি আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংঘাত সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্রতিবাদ-সমাবেশ গণতন্ত্রেরই অংশ। বিরোধী মতালম্বীদের এই গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান করতে হবে।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ‘ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)’ আয়োজিত ডিক্যাব টকে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈনউদ্দিন এবং সঞ্চালনা করে সভাপতি রেজাউল করিম লোটাস।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্য থাকায় তাদের আলোচনার টেবিলে বসাতে অতীতের মতো জাতিসংঘ কোনো মধ্যস্থতা করবে কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে গোয়েন লুইস বলেন, নির্বাচন নিয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের নেই। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। যদি সরকার কোনো সহযোগিতা চায় অথবা যদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে আমাকে সুনির্দিষ্ট অনুরোধ করা হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের উদ্বেগের জায়গাগুলো তুলে ধরি। যেমন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার সম্প্রতি তার প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এগুলো এড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত এড়িয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এ মুহূর্তে জাতিসংঘের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেই।

ডিসেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ঘোষণা জনগণের মনে উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। সামনের দিনগুলো নিয়ে জাতিসংঘের কোনো উদ্বেগ রয়েছে কিনা- জানতে চাইলে ঢাকার জাতিসংঘের প্রধান বলেন, আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আমি কীভাবে দেখছি। গত মে মাসে বাংলাদেশে কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় মানুষকে আহত ও নিহত হতে দেখেছি। আর এটি অবশ্যই উদ্বেগের। এ কারণেই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রমগুলো নিরাপদ করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছি।

তিনি বলেন, প্রতিবাদ ও সমাবেশ গণতন্ত্রেরই অংশ। এগুলোকে সম্মান করতে হবে। যাতে কোনো রাজনৈতিক সংঘাত না ঘটে, সেজন্য আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই। যে কোনো সংকট উত্তরণে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আলোচনার মধ্যমে পথ খুঁজতে হবে।

বৈশ্বিক এজেন্ডায় রোহিঙ্গা ইস্যু ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করে গোয়েন লুইস বলেন, জাতিসংঘ বিষয়টির গুরুত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বৈশ্বিকভাবে অনেক ইস্যু প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। আফগানিস্তান ইস্যুর পরপরই সামনে এলো ইউক্রেন ইস্যু। ইউক্রেন ইস্যু এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে। সেটি অবশ্যই হতে হবে নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভাবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘ কাজ করছে। জাতিসংঘ এ বিষয়ে সহযোগিতা করে যাবে। আমরা রোহিঙ্গা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চাই।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন গোয়েন লুইস। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ চ্যালেঞ্জিং মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিষয়টি খুব চ্যালেঞ্জিং। তাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গাদের অর্থায়নের কতটুকু অংশ জাতিসংঘ পায়- জানতে চাইলে ঢাকার জাতিসংঘের প্রধান বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য দাতারা যে তহবিল দেয়, তার পুরোটা কক্সবাজার ও ভাসানচর যায়। এ অর্থ জাতিসংঘের সদরদপ্তরে যায় না। এ তহবিল থেকে স্থানীয় ব্যবস্থাপনার জন্য মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ ব্যয় করা হয়ে থাকে। বাকি অর্থ রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় করা হয়।

ইউক্রেন ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউক্রেন সংকট নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটি এখন খুব জটিল বিষয়। এ সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে সংলাপ হয়েছে। এ সংকটের সমাধান জরুরি।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অবদানের প্রশংসা করেন আবাসিক সমন্বয়কারী। তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের ৬ হাজার ৮০০ জনের বেশি শান্তিরক্ষী রয়েছেন। বাংলাদেশের পাঁচ শতাধিক নারী শান্তিরক্ষী রয়েছেন। এটা খুব ইতিবাচক। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে জাতিসংঘ বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে বলেও জানান গোয়েন লুইস।