বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় বিলঅঞ্চল নামে খ্যাত সাতলা-হারতা-জল্লা ইউনিয়ন। ওই তিন ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক মাছের ঘের। মাছ চাষ করা লাভজনক হওয়ায় প্রতিটি মাছের ঘের সর্বনিম্ন ৫০ থেকে ৬০ একর ও ৮০ থেকে ২০০ একর জমিতে চাষ করা হয়। প্রতি বছর ওই অঞ্চলের মানুষ ৮ মাস মাছ চাষ করে থাকে। মাছ চাষ করে বেকারাত্ব দূর করলেও রাস্তাঘাট নিয়ে বিপাকে পড়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ওই তিন ইউনিয়নের সাধারন মানুষের চলাচলের জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে রাস্তা মেরামত করলেও দুই থেকে চার মাসের মধ্যে ভেঙ্গে ছোট হয়ে যায়। ওই তিন ইউনিয়েনের একাধিক রাস্তা বিলিন হওয়ার পথে। রাস্তার দুই পাশে অরক্ষিত ও অব্যবস্থাপনায় মাছে ঘের হওয়ায় টেকসই রাস্তা নির্মান করলেও মাছের ঘেরের কারনে রাস্তাগুলো থাকছেনা। প্রতিটি ঘেরে রুই, কাতল. সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, সিং, গজাল, পাঙ্গাস, হাইব্রিড কই মাছ সহ নানা প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জল্লা ইউনিয়নের কারফা থেকে সাতলা ১১কিলোমিটার সড়কটি দুই পাশে এজিং সহ ২৬ ফুট থাকার কথা বতর্মানে রয়েছে ৮-১০ ফুট, টাকা বাড়ি থেকে মুন্সিরতাল্লুক ওপদা রাস্তা পর্যন্ত (পৌনে চার কিলোমিটার) এই সড়কটির ২ বার টেন্ডার হলেও ঠিকাদাররা কাজ না করে চলে যায়। পুনরায় আবার টেন্ডার হলে আধা কিলোমিটার রাস্তা কার্পেটিং করলেও বাকি রাস্তা করতে পারেনি ঠিকাদার। ওই সড়কটি উপরে ১২ ফুট থাকার কথা, বতর্মানে আছে ৫-৬ ফুট, পীরের পাড় রাস্তা থেকে মুন্সির তাল্লুক (৩ কিলোমিটার) এই সড়কটি২০২০-২১ অর্থ বছরে অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি থেকে নির্মান করা হলেও মাছের করাল গ্রাসে রাস্তাটি ৪-৫ ফুট আছে। কারফা স্কুলের পূর্ব পাশের রাস্তা হতে দক্ষিন দিকে শহীদ স্মরনিকা ডিগ্রী কলেজ, সাড়ে ৩ কিলোমিটার রাস্তাটিরও একই অবস্থা। কুড়লিয়া বাজার হইয়া অবণি বাড়ৈ বাড়ি থেকে দক্ষিন দিকে হারতা সড়ক পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা একই। হারতা ইউনিয়নের কালবিলা থেকে হারতা সড়কসহ ১০-১৫টি রাস্তার অবস্থা বেহাল রয়েছে। সাতলা ইউনিয়নে সবচেয়ে ঘেরের সংখ্যা বেশি থাকায় এই ইউনিয়নের রাস্তাগুলো নিয়ে বেশ ভোগান্তিতে রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। গত মঙ্গলবার মাসিক সমন্বয় সভায় স্থানীয় জনপ্রতিধিরা ও উপজেলা প্রকৌশলী এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাছের ঘেরের মালিকদের খামখেয়ালি, অব্যবস্থাপনা রাস্তাগুলো মেরামত করেও টিকাতে পাড়ছেনা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাজাপুর আদর্শ মাছের ঘেরের সভাপতি রেজাউল করিম জানান, মাছের ঘেরের কারনে রাস্তার সমস্য হচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু মাছের চাষের কারনে বেকারত্বও দূর হচ্ছে। তাই এই বিষয়গুলোকে প্রধান্য দিয়ে সমন্বয় করে কাজ করলে ভালো হয়। জল্লা ইউনিয়নের মুন্সিরতাল্লুক গ্রামের ০৪ নং ওয়ার্ডেও ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম মল্লিক জানান, জল্লা ইউনিয়নসহ দুই শতাধিক মাছের ঘের রয়েছে। ঘেরের কারনে রাস্তাগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে। অচিরেই এর সমাধান না হলে সাতলা-হারতা-জল্লা ইউনিয়নের সমস্ত গ্রামীন অবকাঠামো রাস্তাগুলি টিকানো যাবে না। সরকারের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বিনষ্ট হচ্ছে রাস্তার পিছনে কিন্তু সুফল পাচ্ছে না সাধারন মানুষ। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অয়ন শাহা জানান, সাধারন মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য রাস্তা মেরামত ও পূর্ন নির্মাণের জন্য সরকার বরাদ্ধ দেয়। সেই বরাদ্দ দিয়ে রাস্তা মেরামত করলেও ঘেরের চাষ করা মাছগুলো রাস্তা খেয়ে ফেলছে। ঘেরের মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অব্যবস্থাপনায় মাছ চাষ করার কারনে অচিরেই ওই তিন অঞ্চলে রাস্তা বিলিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্রæত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহন করলে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
ঠিকাদার নজরুল ইসলাম বাচ্চু জানান, ওই তিন ইউনিয়নে কাজ করতে গেলে আমাদের সিকিউরিটির টাকাও থাকে না। এছাড়াও কাজ করার দুই-চার মাসের ভিতর রাস্তা ভেঙ্গে পরে । মাছের ঘেরের কারনে সমস্য সৃষ্টি হয়। তাই কোন ঠিকাদার ওই তিন ইউনিয়নে কাজ করতে চায়না।
উপজেলা প্রকৌশলী মইদুল ইসলাম জানান, কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে সরকার রাস্তা করছে । আর সেই রাস্তা মাছের ঘেরের কারণে বিনষ্ট হচ্ছে এটা কোন ভাবে মেনে নেওয়া যায় না। ওই তিন ইউনিয়নে কোন ঠিকাদার কাজ পেলে করতে যেতে চায় না। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী রাস্তা করতে গেলে বিপাকে পড়তে হয় ঠিকাদারদের । এ বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণতি বিশ্বাস জানান, মাছের ঘেরের কারনে রাস্তা টিকানো যাচ্ছে না এ কথা সত্য। এবিষয়ে ঘেরের মালিকদের নোটিশ করা হবে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাস্তার এজিং থেকে ১০ ফুট দূরত্ব রেখে চারদিকে নেট ও প্লাসাইটিং করে মাছের ঘের সহ বিভিন্ন স্থাপনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা এই আইন অমান্য করে মাছের ঘের সহ স্থাপনা করবে তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আ: মজিদ সিকদার বাচ্চু জানান, মাছের ঘেরের কারনে রাস্তা করা যাচ্ছে না এবং যেগুলো করা হয়েছে তা টিকানো যাচ্ছে না। অতিদ্রæত ঘেরের মালিকদের নিয়ে বিষয়টি সমাধান করা হবে। যারা সরকারের আইন অমাণ্য করে মাছের ঘের করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসণকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।