পরিবেশের নানাবিধ দূষণ পৃথিবী জুড়েই আনুপাতিক হারে বেড়েছে। চারিদিকে শিল্পায়নের চাপে আগামীর প্রাণ-প্রকৃতি নিঃসন্দেহে পড়তে যাচ্ছে বড় হুমকির মুখে।


এর সব চেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জলবায়ুতে। এরইমধ্যে তা দৃশ্যমান। এমনকি দক্ষিণ মেরুর বরফ গলতে থাকার আশংকাজনক তথ্যও পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় জরুরি পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করতে না পারলে আগামীতে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পড়বে সবচেয়ে বেশি হুমকিতে।

এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দু’টো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সুইডেনভিত্তিক এয়ার টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের তালিকায় পরপর দুবছর (২০২০ এবং ২০২১) শীর্ষস্থানে ছিল বাংলাদেশের নাম। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত বাতাসের শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। তালিকায় প্রথম স্থানটি ছিল দিল্লির। এমন পরিসংখ্যানও আইকিউ এয়ারের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ১ কোটির বেশি মানুষ এই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে। বায়ুদূষণের সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর বায়ুর পরিমাপকের চাইতে ১৫ গুণ বেশি দূষিত এবং এন্যুয়াল বাংলাদেশ ন্যাশনাল এমবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ডস (বিএনএএকিউএস) এর নির্ধারিত পরিমানের চাইতে ৫ গুণ বেশি দূষিত।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডির) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সিপিডির রিসার্চ ফেলো সাইয়েদ ইউসুফ সাদাত এই গবেষণাটি প্রস্তুত করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে দেশে বার্ষিক বায়ুদূষণের হার ১৩ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণ চলার সময় এমন পরিসংখ্যান আঁৎকে ওঠার মত। ১৯৯৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই সময়ে গড়ে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বায়ুদূষণ বেড়েছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, বর্ষায় এই দূষণ সর্বনিম্ন থাকলেও শীতে এটি থাকে সর্বোচ্চ।

অতিরিক্ত বায়ুদূষণের কারণ
অতিরিক্ত বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ যানবাহনের ধোঁয়া। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শুধু ঢাকা শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ লাখ হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে ২৮৩ শতাংশ। পাশাপাশি অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যাও কম নয়, যা বায়দূষণের অন্যতম বড় কারণ। শুধু যানবাহন বৃদ্ধির কারণেই নয় বরং ফিটনেসবিহীন পুরাতন লক্করঝক্কর গাড়ির অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ, এলোমেলো ট্রাফিক ব্যবস্থাকেও এই দূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বায়ুদূষণের আরও বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ইটভাটাগুলোকে। তথ্য বলছে, ইটভাটাগুলোতে কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ইট উৎপাদন হয়। যার পুরোটাই কয়লা ও অন্যান্য ক্ষতিকর জ্বালানি ব্যবহার করে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি বায়ুমণ্ডলে।

এর সঙ্গে আরও একটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো ভবন নির্মাণ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাজ। নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং সেগুলো পরিবহনের সময়ও বাতাসে ধুলোবালি থেকে বেড়েছে দূষণ।

সিপিডির ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কয়লাভিত্তিক বিভিন্ন কারখানা, বর্জ্য পোড়ানোও দূষণ বাড়ার অন্যতম আরেকটি কারণ। কৃষিজ বর্জ্য সবচেয়ে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের যেসব বর্জ্য ধ্বংস করা হয়, এর মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য, যা বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে।

প্লাস্টিক দূষণ:
শুধু বায়ুদূষণ নয়, পরিবেশ দূষণের আরেকটি অন্যতম বড় কারণ প্লাস্টিক দূষণ। শুধু ঢাকাতেই ২০০৫ সাল থেকে ২০২০ সাল প্লাস্টিকের ব্যবহার বাৎসরিক জনপ্রতি ৯ দশমিক ২ কেজি থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এটি বেড়ে যেতে পারে ৪০ কেজিতে। সহজে ধ্বংস হয় না বিধায় পরিবেশের প্রভাব মারাত্মক।

দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি:
দূষণ শুধু দূষণই নয়। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে মানবদেহেও। সিপিডির এই গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণের ফলে মানুষের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, ফুসফুসের সমস্যা, লাং ক্যান্সার এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ হতে পারে।

অন্যদিকে, প্লাস্টিক দূষণের ফলে, চোখ জ্বালাপোড়া, অন্ধত্ব, ফুসফুসের সমস্যা, লিভার ড্যামেজসহ নানান সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা খাবারের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে আশংকাজনক হলো, এই দূষণ সদ্য জন্মানো শিশুর নিউরোলজিকাল সমস্যাও তৈরি করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৪ বছর ও বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

পরিসংখ্যান বলছে শুধু ২০১৯ সালেই সারাদেশে বায়ুদূষণজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৫ জন মানুষ, যা ওই বছরে মোট মৃত মানুষের ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। গত বিশ বছরে এই মৃত্যুহার বেড়েছে ৯ শতাংশ।

এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) এর অথ্য অনুযায়ী, দূষণের কারণে ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষের গড় আয়ু কমে গেছে ৮ বছর।

উত্তরণের উপায় কী?
সরকারিভাবে দূষণ রোধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর তেমন সুফল নেই বললেই চলে। এর একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯৯৫ সালে পরিবেশ দূষণ রোধে পলিথিনের ব্যাগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও, বর্তমানে এমন কোনো শপিংমল থেকে ফুটপাতের দোকান পাওয়া যাবে না যেখানে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করা হয় না। মাঝেমধ্যে দিবসকেন্দ্রিক বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

তবে দূষণ বিষয়টির ব্যাপ্তি এত বেশি যে, আদতে এটি সরকারের একার পক্ষেও রোধ করা সম্ভব না। এ বিষয়ে সিপিডি বেশ কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে। এগুলো হলো-

• নীতিনির্ধারক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আরও বেশি আন্তরিক হয়ে একসঙ্গে কাজ করা।
• প্লাস্টিকের ব্যবহার আরও বেশি নিরুৎসাহিত করা।
• ২০১৯ সালের দূষণ আইনের আরও কড়াকড়ি আরোপ করা।
• পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মনিটরিং করা।
• শুল্ক হার কমিয়ে হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমোদন দেওয়া।
• নির্মাণ স্থাপনায় ইটের পরিবর্তে সিমেন্টের ব্লক ব্যবহার করা।
• নিয়মিত ভিত্তিতে পরিবহনের ফিটনেস টেস্ট করা।
• নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজে আরওও বেশি সচেতন হওয়া।
• নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা ও সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
• দূষণ সম্পর্কিত ডাটাবেজ তৈরি, নিয়মিত আপডেট করা ও মনিটরিং করা। সর্বোপরি দূষণ রোধে সর্বসাধারণের মধ্যে আরও বেশি সচেতনতা তৈরি করা।
• বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা।