রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বড় সমাবেশ আয়োজনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমন বাস্তবতায় এই সমাবেশ যুবলীগের হলেও ক্ষমতাসীন দলটির মর্যাদার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শুক্রবারের এই সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেবে। জড়ো হবে সংগঠনের দশ লাখ নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ী।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী আজ। প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তির এই দিনে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডাকা জনসমাবেশে ১০ লাখ লোকের উপস্থিতি ঘটাতে চায় সংগঠনটি।

নির্বাচনের এক বছর আগেই জনসমাবেশ করে শক্তি দেখাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বড় সমাবেশ আয়োজনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমন বাস্তবতায় সমাবেশ যুবলীগের হলেও এটি ক্ষমতাসীন দলটির মর্যাদার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আয়োজক সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শুক্রবারের এই সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেবে। জড়ো হবে সংগঠনের দশ লাখ নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ী। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

যুবলীগের এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বেলা দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সভামঞ্চে উপস্থিত হবেন তিনি।

এ সমাবেশের মধ্যে দিয়ে কার্যত দীর্ঘদিন পর জনসমাবেশে আসছেন যুবলীগের সাংগঠনিক নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা মহামারির পর ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন তিনি একটি জনসভায় বক্তব্য দেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতি নির্বাচনমুখী হচ্ছে। তবে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা যাতে তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে দুই দলকেই। কর্মসূচি পালনে তাদেরকে সহনশীল হতে হবে।

সুবর্ণজয়ন্তীতে শক্তির মহড়ায় যুবলীগ
১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করে যুবলীগ।

১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক যুব কনভেনশনের মাধ্যমে দেশের প্রথম যুব সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যুবলীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তার ভাগ্নে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছে শেখ মনির সন্তান শেখ ফজলে শামস পরশ।

যুবলীগ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সুবর্ণজয়ন্তীতে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় যুব মহাসমাবেশ করার লক্ষ্যে প্রতিদিনই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করেছেন। প্রস্তুতি সভা হয়েছে দেশের সব জেলা-উপজেলায়। ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যুবলীগ প্রস্তুতি সভা করেছে।

গত কয়েকদিন ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলেছে সভামঞ্চ তৈরির কাজ। শুক্রবার সন্ধ্যায় দেখা গেছে সমাবেশের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। যেহেতু সরকারপ্রধান এই সমাবেশে যোগ দেবেন, তাই সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বুধবার থেকে উদ্যানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। উদ্যানের প্রবেশমুখগুলোতে রয়েছে পুলিশের সতর্ক উপস্থিতি। প্রবেশমুখ ঘিরে থাকা খাবারের দোকানগুলোও এদিন বসতে দেখা যায়নি। দর্শনার্থীদেরও আনাগোনা ছিল অনেক কম।

সমাবেশের আগের রাতে উদ্যানের আশপাশে যুবলীগ কর্মীদের উপস্থিতি খুব বেশি দেখা যায়নি। উপস্থিত নেতাকর্মীরা সবাই ব্যানার-ফেস্টুন টানানোর কাজে ব্যস্ত। তারা বলছেন, ঢাকার বাইরে থেকে যারা এসেছেন তারা সবাই ক্লান্ত। নগরীর বিভিন্ন হোটেলে তারা বিশ্রাম নিচ্ছেন। তবে শুক্রবার সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে যোগ দেবেন তারা।

সুবর্ণজয়ন্তীতে শক্তির মহড়ায় যুবলীগ
যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তীতে রাজধানী জুড়ে দেখা যায় ব্যানার আর ফেস্টুন। ছবি: নিউজবাংলা
সমাবেশ ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রস্তুতির পরিবেশ রয়েছে। রাজু ভাস্কর্য চত্বরসহ উদ্যানের গেটের আশপাশ এলাকায় শুধু ব্যানার আর ফেস্টুন। এত ব্যানার ঝোলানোরও পরও সন্তুষ্ট নন যেন কর্মীরা। ফাঁকা থাকা জায়গাগুলোতে সন্ধ্যার দিকেও ব্যানার ঝুলাতে দেখা গেছে। অনেকে আবার ব্যানার হাতে ফাঁকা জায়গা খুঁজছিলেন।

বরগুনা জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি এলমান উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের অবস্থান জানান দেয়ার জন্য এই ব্যানার ঝোলানো হচ্ছে।

‘আমরা এখন কয়েকজন আগে আগে বরগুনা থেকে চলে এসেছি। থাকছি গুলিস্তানের রমনা হোটেলে। বাকিদের লঞ্চগুলোও বরগুনা থেকে এতক্ষণে ছেড়ে দিছে। তারা আজ রাতে রমনা হোটেলে থাকবে। এরপর সেখান থেকে কাল সকালে সবাই সমাবেশে যোগ দিব।’

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানার কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মাহবুব আলম স্বপন বলেন, ‘আমরা সাত-আটজন বিকেলেই ঢাকায় চলে আসি। একটু আগে বাকিদের লঞ্চ ঘাট ছেড়েছে বলে শুনেছি। শুধু পটুয়াখালী থেকেই ১৫ হাজার লোক আসছে। রাতের মধ্যে সবাই ঢাকায় এসে যাবে।’

সবাই মিলে জনসমাবেশকে জনসমুদ্রে রূপান্তরের প্রত্যয় তার কণ্ঠে। মাহবুব বলেন, ‘বিএনপি ছোট ছোট সমাবেশ করে মহাসমুদ্র বলে। আমরা কাল বিএনপিকে দেখিয়ে দিতে চাই, জনসমুদ্র কাকে বলে।’

নিরাপত্তা বলয়

সমাবেশস্থলের বাইরে ও ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় তিন হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. শহিদুল্লাহ।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমরা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছি। সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছি। সমাবেশের আশপাশে ২৯টি পয়েন্টে আমাদের ফোর্স মোতায়েন থাকবে।’

সমাবেশ ঘিরে কোনো ধরনের সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডের হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

বন্ধ থাকবে কিছু সড়ক

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের কয়েকটি এলাকার রাস্তা বন্ধ বা রোড ডাইভারশনের কথা জানিয়েছে ডিএমপি। নগরবাসীকে এজন্য বিকল্প সড়ক ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।

যে সড়কগুলো বন্ধ করা হবে

কাঁটাবন ক্রসিং, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং, পুলিশ ভবন ক্রসিং, কাকরাইল চার্চ ক্রসিং, ইউবিএল ক্রসিং, হাইকোর্ট ক্রসিং, দোয়েল চত্বর ক্রসিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টার, জগন্নাথ হল ক্রসিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাস্কর্য ক্রসিং ও উপাচার্য ভবন ক্রসিং।

জনসভায় প্রবেশ যে পথে

সমাবেশে প্রবেশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সবুজ কার্ডধারী অতিথিরা ৩ নম্বর গেট বা রমনা কালি মন্দির দিয়ে সমাবেশস্থলে প্রবেশ করবেন। রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা জেলা উত্তরের নেতাকর্মীরা প্রবেশ করবেন ১ ও ২ নম্বর গেট দিয়ে।

খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং বৃহত্তর ফরিদপুর, ঢাকা জেলা দক্ষিণ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের নেতাকর্মীরা প্রবেশ করবেন ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গেট দিয়ে।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের নেতাকর্মীদের মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার, পলাশী হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে হবে।

বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের যারা বাসে আসবেন তাদের পদ্মা সেতু হয়ে বাবুবাজার ব্রিজ দিয়ে গুলিস্তান হয়ে নগর ভবনের সামনের রাস্তা, বঙ্গবাজার-সংলগ্ন রাস্তাগুলো এবং জিরো পয়েন্ট-ওসমানী উদ্যান সংলগ্ন এলাকা দিয়ে সমাবেশে আসতে হবে।

ময়মনসিংহ বিভাগের নেতাকর্মীরা মহাখালী, মগবাজার ফ্লাইওভার, কাকরাইল চার্চের বামে মোড়সংলগ্ন রাস্তা হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করবেন।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নেতাকর্মীদের গাবতলী, মিরপুর রোড, সায়েন্স ল্যাব ক্রসিং, নিউমার্কেট ক্রসিং অথবা গাবতলী, মিরপুর রোড সায়েন্স ল্যাব, কাঁটাবন, নীলক্ষেত ক্রসিং, পলাশী ক্রসিং হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে হবে।

যুবলীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাংবাদিকরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী ভিআইপি গেট অর্থাৎ শিখা চিরন্তনী গেট দিয়ে প্রবেশ করবেন।